কবি পিন্টু পোহানের ১২-টি কবিতা

 কবিতা এবার বারো / পিন্টু পোহান।


                    ১

   ১

লেখা আছে ইতিহাসে.../ পিন্টু পোহান।


আয়নার সামনে দাঁড়ালে আপনাদের 

নিশ্চয়ই মনে হয়, আপাদমস্তক ব‍্যর্থতা

নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এক ব‍্যর্থ মানুষ!


জানলায় মুখ রেখে দেখুন, কেউ না কেউ

বলে যাবে, এ হল ব‍্যর্থ একজন।

মানুষ যাকে গ্রহণ করেনি

সমাজ যাকে দিয়েছে ধিক্কার!


আপনার কপালে কোনও প্রেমিকা জুটল না

মাত্র এই একটি কারণে...

বিষয়টা খুবই মজার!

তবুও আপনি  গান গান, কবিতা লেখেন

একটা গল্পও লিখেছিলেন, 

যে বোকা বুড়োটা  পাহাড় সরায়!


বুঝতে পারছি রসিকতা সহ‍্য হচ্ছে না

ভিতরে ভিতরে খুবই ভেঙে পড়েছেন

নিজেদের ব‍্যর্থ মনে হচ্ছে আপনাদের!

আপনারা ভাবছেন, যুগের পর যুগ চলে গেল

সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে

কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, ফ‍্যাসিবাদের বিরুদ্ধে 

লড়াই করে গেলেন

নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে  লড়াই করলেন 

অথচ 

পৃথিবী আজও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে!


পৃথিবী কি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে?


এগিয়ে চলা চ‍্যানেলের এক সংবাদ পাঠিকা

পায়ের ওপর পা, হাতে একটা জ্বলন্ত সিগারেট 

সমাজ হয়ে দেশ হয়ে বন্ধু হয়ে জনগণ হয়ে

একদিন এভাবেই প্রশ্ন তুলেছিল,

পৃথিবী বদলাবেন?

আপনারা কবে বুঝবেন

মানুষ আপনাদের পাশে নেই?


আপনি বলেছিলেন সেদিন, ইতিহাসের পাতা ওল্টান...

আজ থেকে মাত্র দেড়শো বছর আগেও

সনাতন পাঠক্রমে লেখা থাকত

স্বামীর চিতায় উঠলে স্বর্গপ্রাপ্তি নিশ্চিত!

ইতিহাসের পাতা ওল্টান...

আজ থেকে মাত্র একশো বছর আগেও

পচা ডিম ছোড়া হত শিক্ষিকার গায়ে

নারীশিক্ষা দেওয়ার অপরাধে!

মনে আছে, ঈশ্বরচন্দ্র মৃত্যুর মুখে পড়েছিলেন

আর রামমোহনের কুশপুতুল দাহ করা হয়েছিল?

হাজার হাজার ব‍্যর্থ জীবন জুড়ে জুড়ে সভ‍্যতা এগোয়!

                    ২


পৃথিবীর গভীর অসুখ  /পিন্টু পোহান


--আপনি আবার ঘুমাতে চল্লেন?

--আমি আপনার বাবুর বাঁধা গোলাম নাকি,

জেগে থাকতে বললেই জেগে থাকতে হবে?

--আপনি সমাজ সচেতন!

--ছিলাম একসময়!

যখন কৃষকরা আত্মহত্যা করছিল আর আপনারা নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছিলেন! যখন অসমে উনিশ লক্ষ মানুষের পায়ের নিচে থেকে দেশ সরে গেল। দিকে দিকে ডিটেনশন ক‍্যাম্প তৈরি হল। গৌরী লঙ্কেশকে খুন করা হল।

--গৌরী লঙ্কেশ?

--চেনেন না? কালবুর্গীর নাম শুনেছেন?বুঝেছি!     বাবু না ডাকলে যার ঘুমই ভাঙে না...

--না,না, আজ বাবু নয় পৃথিবীর এ মহাবিপদে...

--একটি ভাইরাস যদি দেহে ঢুকে যায় সেই ভয়ে!

  তাহলে ঘরেই থাকুন। নইলে আমার মতো    নিশ্চিন্তে ঘুমোন!

--তা কি হয়? পৃথিবীর কঠিন অসুখ!

আমাদেরও কর্তব্য থাকে কিছু!

---তাহলে আজই এসি-ফ্রিজ বর্জন করুন!

যুদ্ধাস্ত্রগুলো ফেলে দিন সাগরের জলে!

--তা কি হয়?

--বাবু বললেই হয়ে যাবে! কিন্তু বাবুরা বলবে না!

হিসেব মশাই! আপনাদের জাগা আর জেগে ওঠাটাও হিসেবের খেলা।

থাক! এবার আমায় যেতে দিন!

পৃথিবীর গভীর অসুখ জেগে উঠছে চারিদিকে!


              

                   ৩



দেবতা নির্মাণ.../ পিন্টু পোহান


অনেক দিন দেওয়ালে কোনও যুদ্ধ ছিল না

গ্রামের মেয়েরা খড়ি দিয়ে লিখে আসছিল 'প্রেম'

যুবকেরা ভাবছিল, চাকরিটা পেয়ে গেলেই এবার...

মা ভাবছিলেন, এই বৈশাখে 

টালিগুলো বদলে নেবেন তারপর...


ভক্তরা খুব মুষড়ে পড়েছিলেন 

বহুদিন হয়ে গেল দেওয়ালে কোনও যুদ্ধ নেই

যুদ্ধ না থাকলে তাঁর মাহাত্ম্য বোঝে না

এমন বেকুব জনগণ!

কত দিন আর ইতিহাস খুঁটে খুঁটে 

কীট-পতঙ্গ এনে দেওয়া যায়!


ভক্তরা মুষড়ে পড়েছিলেন !


তারপর প্রতিটা গল্পে যেমন হয়...

গল্পের দাবি কিংবা লেখকের মুন্সীয়ানা!


ঈগলের মতো এসে আতঙ্ক রেখে যায় যাত্রী বিমান

আতঙ্ক ছুঁয়ে নেয় আমাদের ঘরগেরস্থালি

ভক্তরা খড় দিয়ে দেবতা বানান

যুদ্ধের দেবতা ফের জনতার পূজা পান।


                   ৪


দলিল.../ পিন্টু পোহান


আত্মহত্যার মিছিলের একটা

দলিল আছে আমার কাছে

আপনাদের লাগলে বলবেন!


গর্ভঘাতকের কিছু হত্যার 

ছবি আছে আমার কাছে 

আপনাদের লাগলে বলবেন!


অরণ্য থেকে উচ্ছেদ হওয়া আদিবাসীদের

কিছু হাড় আছে আমার কাছে

আপনাদের লাগলে বলবেন!


লক্ষ লক্ষ মানুষের ঘর হারানোর  

কিছু গল্প আছে আমার কাছে

আপনাদের লাগলে বলবেন!


এত ভার আমি আর বইতে পারছি না!


আপনাদের প্রতিটা লড়াইয়ের পাশে

মানুষ কেমন দল বেঁধে আসে

শ'য়ে...শ'য়ে...হাজারে...হাজারে...

লক্ষ্মণরেখার নিরাপত্তায় আপনারা

ডিম ফুটিয়ে কী সুন্দর বিপ্লবী তুলে নেন!


যে কবি নাভি ছেড়ে উঠতে পারেনি দেখি সেও

নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে  শান্তির ঘরে ছুড়ে দেয় ছাই!

গদ্য-পদ‍্য জুড়ে শুধু চিৎকার ওঠে,লড়াই! লড়াই!

লাইকের বন‍্যা বয়ে যায় ফেসবুকে!


আর আমি 

গর্ভঘাতী দাঙ্গার

আত্মঘাতী  কৃষকের

অরণ্য থেকে উচ্ছেদ হওয়া আদিবাসীর

 দলিল দস্তাবেজ-ছবি-হাড়গোড় নিয়ে 

হেঁটেই চলেছি....

যুগ থেকে যুগান্তরে...


আপনাদের লাগলে বলবেন!


আপনাদের লাগলে বলবেন

এত ভার আমি আর বইতে পারছি না!



                     ৫


গুণী / পিন্টু পোহান


এ এক আশ্চর্য বাড়ি সন্ধ্যায় জাগে

আলো জ্বলে, ছায়া সরে 

সিঁড়িতে পায়ের শব্দ ওঠে!

বাবা-মা অথর্ব

ছেলে বিদেশে সেটল্

ছেলের বন্ধু এসে আলো জ্বেলে যায়।


আলো জ্বেলে যাওয়া কাজ হদ্দ বেকার


ও তেমন গুণী ছেলে নয়!

      

           ৬


ডাক্তার    / পিন্টু পোহান


শহরের হোর্ডিং সাক্ষী

ডাক্তার তৈরি করার জন্য নয় 

ডাক্তারি পড়বে বলে যারা 

জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় বসেন 

তাদের পড়ানোর জন‍্য 

নেওয়া হয় মাত্র তিন লক্ষ টাকা!


শহরের হোর্ডিং সাক্ষী

বেসরকারি মেডিকেল কলেজেগুলোতে

ডাক্তারি পড়াতে নেওয়া হয় 

৬০ থেকে ৭০ লক্ষ মাথা পিছু!


শহরের হোর্ডিং সাক্ষী

সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে    

 চিরকালই সিট থাকে কম!


কেউ চাষের জমি বিক্রি করে এসেছিলেন

কেউ বাস্তুভিটা

কেউ কেউ নিজেকেই মটগেজ রেখে ...


বাবার কথা মনে পড়লেই মনে পড়ে যায়,

ভাঙাচোরা একটা সাইকেল নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন

কোথায় স্বল্প সুদে ঋণ পাওয়া যায় তারই খোঁজে!

আর মা

সস্তা একটা আটপৌরে শাড়িতেই তো জীবনটা কাটিয়ে দিয়েছিলেন...


তবুও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাঁরা 

রাতের পর রাত জেগে আছেন 

মানুষকে বাঁচাবেন বলে

যে মানুষ কখনও বলেনি,

এক লক্ষ না হোক অন্তত হাজারটা

 সরকারি মেডিকেল কলেজ 

তৈরি করে দেওয়া হোক ওদের জন্য 

যাতে ওরা কম খরচে ডাক্তারি পড়তে পারে!



              ৭




বহিরাগত/ পিন্টু পোহান।


"বহিরাগত" কাকে বলে আমরা ঠিক জানতাম না

আমরা কেউ লাঠির ওপর টুপি টাঙিয়ে

তাকেই মেনেছি মান‍্যবর

তার কথাই মেনেছি অক্ষরে অক্ষরে

বলেছি, বিদেশ থেকে শরণার্থী হয়ে ...

অথচ পাশের মানুষটাকেই দেখছিলাম

সন্দেহের চোখে!

দেশ-দেশান্তরে আমরা খবর পাঠাচ্ছিলাম

আমরা  ডিটেনশন ক‍্যাম্প তৈরি করছিলাম

খরচ করছিলাম হাজার হাজার আর

উল্লাস করছিলাম এই বলে,

দেশ থেকে এবার বিদেশি তাড়ানো হবে।

বলছিলাম জোর গলায়,

সি এ এ অর্থাৎ ক‍্যা একটি মহান আইন

যার মাধ্যমে বিদেশ থেকে আগত শরণার্থীরা নাগরিকত্ব পাবেন!

তখন কি আমরা জানতাম

এই আইনের সুযোগ নিয়ে বিদেশ থেকে যিনি প্রথমেই আসবেন , তিনিই "করোনা!"

আন্তর্জাতিক বিমান থেকে নেমেই

 বলবেন, সুপ্রভাত ভারতবর্ষ!

আর ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে 

আমাদেরকে স্বীকার করে নিতে হবে

ভারতের মাটিতে যে যেখানে আছে তারা সবাই ভারতবাসী!


      ৮



আজ থেকে.../ পিন্টু পোহান


প্রতিটা শব্দের বিনিময়ে 

আমি একটা চুম্বন চাই

প্রতিটা স্লোগানের বিনিময়ে 

একটা হাত!

            

   ৯


#কবিতা

সেই বিড়ালের গল্প.../ পিন্টু পোহান


আমি কি লকডাউন ঘোষণা করেছিলাম?

আমি কি লকডাউন তুলেছি?

আমিই কি বন কেটে করেছিলাম মরুভূমি?

আপনারা সবই জানেন!


অথচ সৃষ্টির সেই আদিযুগ থেকে

আমার বুকেই 

নীতিকথা ধর্মগ্রন্থ উপদেশাবলী

একে একে চাপিয়ে যাচ্ছেন!


দুবেলা ঠিকমতো যার ভাত-ই জোটে না

লোভ সংবরণ করতে বলছেন তাকে!

দুমুঠো ভাতের অন্বেষণে মানবেতর হয়ে ওঠে 

যে সব জীবন

তাদের বলছেন, ধৈর্য্য ধরো! ধৈর্য্য ধরো!


এ বলছে, ন‍্যায়ের পথে চলো!

ও বলছে, সত‍্যের পথে!

'সত্য' আর 'ন‍্যায়ে'র মাথা আপনারাই তো

চিবিয়ে খেয়েছেন!


ঘন্টাটা রাজার গলায় বাঁধার কথা ছিল,

অসহায়-নিরুপায় আমাদের গলায় নয়!


আপনারা কি জানেন না, সত‍্য আর ন‍্যায়ের পথে চলা কাদের প্রয়োজন?

যে চাষ করে, না কি চাষির ভাগ্য নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলে


কারখানায় যে কল চালায়, না কি  শ্রমিকের 

ভাগ্য নিয়ে যারা...?


আপনারা কি জানেন না–

আমাদের ছেলে ও মেয়েরা যখন 

পাতার পর পাতা ভরিয়ে চলে 

'একটি গাছ, একটি প্রাণ' লিখে লিখে

ঠিক তখনই কারা কারা এবং কীভাবে

বনজ সম্পদ ঘরে নিয়ে যাবে বলে

দলিল-দস্তাবেজ তৈরি করে নেয়?


নীরবে উচ্ছেদ হল দশ লক্ষ বনবাসী

মজুতদারকে দেওয়া হল সবুজ সঙ্কেত

অর্থনীতি চাঙ্গার দাওয়াই বলে

খোলা বাজারে তোলা হল  পাতালগুলোকে!

আপনারা চুপ করে রইলেন।

কাদের জন্য?


যারা যারা নিজেকে বাঁচাতে বিদ্বেষের 

বীজ বুনে যায়

মানুষখেকোদের জন্য তৈরি করে যুগে যুগে

 নতুন মুখোশ?


 

এই যে আপনারা কথায় কথায় অহিংসার মন্ত্র

পড়ান

কেন? বলি কীসের জন্য?

আমি কি অস্ত্র তৈরি করি, না কি অস্ত্রের কারবারি?  

পুলিশ-মিলিটারি কিংবা প্রতিরক্ষা খাতের বাজেট কি আমার হাতে?

আমি কি বিজ্ঞানীদের উৎসাহ দিচ্ছি পরমাণু বোমা বানাতে?

 


ঘন্টাটা রাজার গলায় বাঁধার কথা ছিল,

অসহায়-নিরুপায় আমাদের গলায় নয়!


অথচ সৃষ্টির সেই আদিযুগ থেকে

আমার বুকেই 

নীতিকথা ধর্মগ্রন্থ উপদেশাবলী

একে একে চাপিয়ে যাচ্ছেন!


              (১০)


অশ্বারোহীরা / পিন্টু পোহান


পাথরে খুরের শব্দ হলে 

অনেকেরই ঘুম ভেঙে যাচ্ছে এখন


গোষ্ঠী ছেড়ে সমগ্রকে নিয়ে ভাবতে শেখেনি যারা 

সেইসব ছোট ছোট গোষ্ঠীপতিরাও

হাত তুলে বলছে, আট নম্বর!


নিজেকে চেনা সম্পূর্ণ না করা যুবক-যুবতীরা কলরব করতে করতে বলছে, আট নম্বর!


সদ‍্য, প্রাক্তন এবং প্রয়াত রাজা-রানিরা

বিবর্তনের পথ ধরে

আট নম্বর অশ্বারোহীর দাবিদার হয়ে  

ছুটে আসছে!


যিনি জীবিত না, মৃত ঠিক বোঝাও যায় না

ক্ষমতার বৃন্ত থেকে তাঁকে

অতলে তলিয়ে যেতে দেবেন না অশ্বারোহীরা– 

এই বিশ্বাসে তিনিও আসছেন 

বেশ দাম্ভিকতা নিয়ে

বলছেন, আমি!


তবু–


"ভাঁড়ের অভাব নেই, সেনাপতির অভাব

মুখোশ অঢেল, এক মুখের অভাব

আট নম্বর অশ্বারোহীর খোঁজে এসেছিলাম আমরা..."          

  

বলতে বলতে চলে গেল সাত অশ্বারোহী          


ইতিহাসের অতলে!


              (১১)


ছেলেটা এবং মেয়েটা.../ পিন্টু পোহান


ছেলেটা বলল, শোন।

মেয়েটা বলল, কী?

ছেলেটা বলল, ওই...

আমি তোমায় ভালোবাসি!


মেয়েটা বলল, চল।

ছেলেটা বলল, ভয়!

মেয়েটা বলল, ধ‍্যুৎ

ও যে চিরকালই রয়!


ছেলেটা বলল,ঘর।

মেয়েটা বলল, ঝড়!

ছেলেটা বলল, হাত...

 আমাদের হাত-ই হাতিয়ার!


মেয়েটা বলল, ফুল!

ছেলেটা বলল, পাখি!

মেয়েটা বলল, এসো

ভালোবাসার পৃথিবী আঁকি!


                  ১২


তোমার মধ‍্যে আমার মধ‍্যে কিছু জল রয়ে গেছে

এই শহরের মধ্যে একটা সাগর লুকিয়ে আছে!

                            


Comments

Popular posts from this blog

লেখক পিন্টু পোহান : অজয় পাল